মিরসরাই – সীতাকুণ্ড রেঞ্জের সকল ট্রেইল ও ঝর্ণা:

মিরসরাই – সীতাকুণ্ড রেঞ্জের সকল ট্রেইল ও ঝর্ণা:

_নীল জামশেদ

(বাংলা চ্যানেল সাঁতারু)

আপনারা জানেন মিরসরাই সীতাকুণ্ড রেঞ্জের প্রতিটি ট্রেইল অবিশ্বাস্য রকমের এডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ। অনেকেই এই রেঞ্জের ট্রেইলগুলো নিয়ে সন্দিহান থাকেন। সকলের সুবিধার্তে সব ট্রেইল ও ঝর্ণার সংকলন এই পোস্ট। অনেক তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আপনাদের জন্য এই ছবি সাজানো হয়েছে। যাতে এই রেঞ্জের কোন ট্রেইলে যাওয়ার আগে আপনার জন্য নির্দেশনা পেতে সহজ হয়। ছবিসহ জানতে পারবেন কোন ট্রেইলে কোন ঝর্ণা লুকিয়ে আছে।

কোন ট্রেইলে কোন ঝর্ণা? কিভাবে যাবেন? আশা করছি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন। তবু কারো কোন প্রশ্ন থাকলে আমাকে মেসেজ বা কমেন্ট করে জানতে পারেন।

মিরসরাই – সীতাকুণ্ড রেঞ্জের সকল ট্রেইল ও ঝর্ণা

মোট ট্রেইল: ১০ টি

১. খৈয়াছড়া ট্রেইল (মিরসরাই)
২. নাপিত্তাছড়া ট্রেইল (মিরসরাই)
৩. বোয়ালিয়া ঝর্ণা (মিরসরাই)
৪. ঝরঝরি ট্রেইল (সীতাকুন্ড)
৫. হরিণমারা ট্রেইল (মিরসরাই)
৬. সোনাইছড়ি ট্রেইল (সীতাকুণ্ড)
৭. বাড়বকুন্ড ট্রেইল (সীতাকুণ্ড)
৮. কমলদহ ট্রেইল (মিরসরাই)
৯. সুপ্তধারা ট্রেইল (সীতাকুণ্ড)
১০. সহস্রধারা ট্রেইল (সীতাকুণ্ড)

🔺 এক.

খৈয়াছড়া ট্রেইল (মিরসরাই)
ঝর্ণা ও ক্যাসকেড: ৯ টি
ঝর্ণার নাম: খৈয়াছড়া

খৈয়াছড়াকে বলা হয় মৃত্যুপুরী। খুবই ভয়ানক ও এডভেঞ্চারাস প্রতিটি ঝর্ণা।
খাড়া ট্রেইল, পিচ্ছিল ঝিরিপথে নান্দনিক ভাবে সাজিয়ে আছ। মৃত্যুও ডেকে আনে এখানে। এখানে মোট ঝর্ণা আছে ৯ টি।

কয়েকটি ক্যাসকেড ও আছে, ঝর্ণাগুলোর আলাদা নাম নেই। ১ম ধাপ, ২য় ধাপ, ৩য় ধাপ এভাবে মোট নয়টি ধাপ। শেষ ধাপ গিয়ে আছে একটি কুম। নাম “আমতলী কুম”। এই কুমটি খুব গভীর।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে গেলে চট্টগ্রামগামী যে কোন বাসে মিরসরাই বাজারের আগে বড়তাকিয়া বাজার আর সেই বাজারের রাস্তা আর বাইপাস রোড যেখানে মিলেছে সেখানে খৈয়াছড়া হাইস্কুল এর ঠিক বিপরীত দিকের রাস্তায়(পূর্বদিকে) ঢুকতে হবে। এরপর কিছুদূর সিএনজি তে গিয়ে পায়ে হাঁটা শুরু। এরপর গ্রামের পথ শেষে ঝিরিপথ ধরে এগুতে থাকলে একসময় ঝরনার দেখা মিলবে।

🔺দুই.
নাপিত্তাছড়া ট্রেইল: মিরসরাই

ঝর্ণার নাম:
ক. কুপিকাটাকুম
খ.বান্দরকুম বা নাপিত্তাছড়া
গ. বাঘবিয়ানী

নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ে অবস্থিত একটি জলপ্রপাত।

এখানে মূলত তিনটি ঝর্ণা রয়েছে ঝর্ণা। এগুলো হলো কুপিকাটাকুম, বান্দরকুম ও বাঘবিয়ানী। আর ঝর্ণাগুলোতে যাওয়ার যে ঝিরিপথ রয়েছে সেটাকে নাপিত্তাছড়া ট্রেইল বলে।

যাওয়ার উপায়ঃ

বাংলাদেশের যেকোন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে যাত্রা করে নাপিত্তছড়া আসা যায়। ঢাকা থেকে যেকোনো বাসে করে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের নয়দুয়ারীবাজারে নামতে হবে। এছাড়া ট্রেনেও চট্টগ্রাম নেমে মিরসরাইয়ের নয়দুয়ারীবাজারে আসা যায়। তাছাড়া চট্টগ্রামের অলংকার থেকে বাসে নয়দুয়ারীবাজার যেতে পারবেন। নয়দুয়ারী বাজারে নেমে সেখান থেকে স্থানীয় গাইড নিয়ে অথবা নিজেই নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় চলে যেতে পারেন। নয়াদুয়ারী থেকে হেঁটে যেতে ৩০/৪০ মিনিট লাগবে।

🔺তিন.
বোয়ালিয়া ট্রেইল : মিরসরাই

ঝর্ণার নাম:
ক. বোয়ালিয়া
খ. বাউশ্যা,
গ.অমরমানিক্য ঝর্ণা
ঘ. ন হাইত্যে কুম,
ঙ.পালাকাটা খুম,
চ.উঠান ঢাল,
ছ. আন্দারমানিক ঝর্ণা,
জ.তিন নং ছড়া,
ঝ. কলাতলি ঝর্ণা,
ঞ. লতকাও/ কেম্বাতলী ঝর্ণা
চ. লতা বায়ানী।

বোয়ালিয়া ট্রেইলে আছে বোয়াইল্যা, বাউশ্যা, অমরমানিক্য ঝর্ণা। এছাড়া আছে ন হাইত্যে কুম, পালাকাটা খুম, উঠান ঢাল, আন্দারমানিক ঝর্ণা, তিন নং ছড়া, কলাতলি ঝর্ণা, লতকাও/ কেম্বাতলী ঝর্ণা এবং লতা বায়ানী।

এই ট্রেইলের মূল আকর্ষণ এর হরেক রকমের সৌন্দর্যের কাছেই। এক একটি ঝর্ণা, কুম একেক রকমের সৌন্দর্যের ডালা সাজিয়ে বসে আছে।

এই যেমন উঠোন ঢাল এখানে প্রায় বাস্কেটবল মাঠের আকারের এলাকা দিয়ে প্রবল বেগে পানি বয়ে যায় বর্ষায়। এটিকে প্রায় সমতল একটা ঝর্ণা বলা যায়।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে নামবেন মিরসরাই বাজারে। মিরসরাই কলেজ রোড থেকে ব্র্যাক পোল্ট্রি ফিড পর্যন্ত যাওয়ার সিএনজি পাবেন। ওখানে নেমে পূর্বদিকে হাঁটা ধরবেন।

🔺 চার.
ঝরঝরি ট্রেইল : সীতাকুন্ড

ঝর্ণার নাম:
ক. ঝরঝরি ঝর্ণা
খ. স্বর্গের সিঁড়ি
গ. মূর্তি ঝর্ণা

ঝরঝরি ট্রেইল- সীতাকুন্ড ও মিরসরাই অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দর ট্রেইল এটি। এটি মিরসরাই সীতাকুন্ড অঞ্চলের সবচেয়ে লম্বা ট্রেইল।

তবে এটি অপরিচিত ট্রেইল। অপূর্ব সব ঝর্ণা ক্যাসকেড এবং ঝিরিপথের সমন্বয়ে এই ট্রেইল।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে নামবেন সীতাকুন্ডের পন্থিছিলা বাজারে। ওখান থেকে হেঁটে পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে আধা ঘন্টা হেঁটে ঝিরিপথ ধরবেন।

🔺পাঁচ.
হরিণমারা ট্রেইল: মিরসরাই

ঝর্ণার নাম:
ক. হরিণমারা
খ. হাটুভাঙ্গা
গ. সর্পপ্রপাত
ঘ. নীলাম্বর লেক

এই ট্রেইলটা মিরসরাই রুটের অন্যতম সুন্দর একটি ট্রেইল।

এই ট্রেইলে পাবেন হরিণমারা, হাঁটুভাঙ্গা এবং সর্পপ্রপাত ঝর্ণা।

এছাড়াও সর্পপ্রপাতের পাশে বাওয়াছড়ার মুখ। এই রুটে ঢুকতেই পাবেন অপূর্ব নীলাম্বর লেক।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা অথবা চট্টগ্রামী যেকোনো বাসে সীতাকুণ্ডের আগে ছোট কমলদহ বাজার। বাজারের পরের রাস্তা আর বাইপাস যেখানে মিলেছে সেখানে নামবেন। রাস্তার পূর্ব দিকে ঢুকবেন। বাকিটা রাস্তা ধরা গেলে আর ছড়ার পথ ধরে এগিয়ে যাবেন।

🔺ছয়.
সোনাইছড়ি ট্রেইল: সীতাকুণ্ড

ঝর্ণার নাম:
ক. বাদুইজ্জা খুম
খ. সোনাইছড়ি

সোনাইছড়ি ট্রেইল – এই ট্রেইলটি বাকি ট্রেইলগুলোর তুলনায় অপরিচিত এবং দুর্গম। তবে এককথায় অপার্থিব। বিশাল বিশাল পাথর আর গিরিখাদের সমন্বয়ে এই ট্রেইল।

আছে গভীর বাদুইজ্যা কুম। একপাশে পাহাড়ের খাঁজ আর নিচ দিয়ে চলার পথ। অনেক জায়গায় সূর্যের আলোতেও ছায়া পড়ে।

যাওয়ার উপায়:
ঢাকা থেকে মিরসরাইয়ের পরে নামবেন হাদী ফকিরহাট বাজার। তারপর রাস্তার পূর্ব দিকে হাঁটা ধরবেন।

🔺সাত.

বাড়বকুন্ড ট্রেইল: সীতাকুণ্ড
দর্শনীয় স্থান:

ক. কালভৈরবী মন্দির
খ. বাড়বকুন্ড ঝর্ণা
ঘ. অগ্নিকুণ্ড

বাড়বকুন্ড ট্রেইলে- এই ট্রেইলে পাবেন বাংলাদেশের একমাত্র গরম পানির ঝর্ণা।

কালভৈরবী মন্দির ও অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়ী ঝিরি পথ এবং বেশ কয়েকটি ছোট ক্যাসকেড ও কুম।

যাওয়ার উপায়:
ঢাকা থেকে নামবেন বাড়বকুন্ড বাজারে। সীতাকুন্ডের পরই বাড়বকুন্ড বাজার। বাড়ব কুন্ড বাজার থেকে ৪০ -৪৫ মিনিটের হাঁটা পথ প্রাচীন কালভৈরবী মন্দিরে। ওখান থেকে হেঁটে ঝিরিপথ ধরবেন।

🔺আট.
কমলদহ ট্রেইল: মিরসরাই
ঝর্ণার নাম:

ক. রূপসী ঝর্না
খ. ছাগলকান্দা ঝর্ণা

কমলদহ ট্রেইল – এই ট্রেইলটা এককথায় অসাধারণ। এই ট্রেইলে পাবেন বড় কমলদহ ঝর্ণা সহ মোট চারটি ঝর্ণা।

এই ট্রেইলের ঝর্ণাই বড়। বর্ষায় গেলে অপার্থিব সৌন্দর্য দেখতে পাবেন তবে এটি বিপজ্জনক বেশ।

যাওয়ার উপায়:
ঢাকা থেকে সীতাকুন্ডের বড় দারোগারহাট নামবেন। এখান থেকে একটু হেঁটে পূর্ব পাশের রাস্তা ধরে ঝিরিপথ ধরবেন।

🔺নয়.
সুপ্তধারা ট্রেইল: সীতাকুণ্ড

ঝর্ণার নাম:
ক. সুপ্তধারা
খ. সহস্রধারা

সুপ্তধারা সহস্রধারা ট্রেইল – সীতাকুন্ড রুটের সবচেয়ে সহজ ট্রেইল এটি তবে সুন্দর। এখানে পাবেন সুপ্তধারা এবং সহস্রধারা ঝর্ণা সহ কয়েকটি কুম ও ক্যাসকেড পাবেন।


যাওয়ার উপায়:
ঢাকা থেকে সীতাকুন্ড ইকোপার্কের রাস্তার মাথা থেকে ইকোপার্কে ঢুকলেই দেখিয়ে দিবে।

🔺
দশ.
সহস্রধারা ট্রেইল: সীতাকুণ্ড
দর্শনীয় স্থান:

ক.সহস্রধারা ঝর্ণা ২★
খ.সহস্রধারা লেক★
গ. বুদবুদকুন্ড

সহস্রধারা মূল ট্রেইল- এটিও আগের ট্রেইলের মতো সহজ তবে আগের ট্রেইল থেকে সুন্দর। এই ট্রেইলে পাবেন প্রাচীন এক মন্দির, সহস্রধারা মূল ঝর্ণা, সহস্রধারা লেক এবং বুদবুদকুন্ড।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে সীতাকুন্ড বাজারে নামবেন। এখান থেকে ছোট দারোগাহাটের লোকাল সিএনজি পাবেন।

অসংখ্য ধন্যবাদ সবাইকে।
আশা করছি সবাই ট্রেইলগুলোর সাথে পরিচিত হতে পেরেছেন। তবু যেকোন সময় এই পোস্টটি পড়লে বা ট্রেইলে যাওয়ার আগে কোন তথ্য জানতে চাইলে আমাদের জানান।

দুটি কথা:
১. ভ্রমণে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করবেন না
২. সবকটি ট্রেইল বিপদজনক। উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন।

আপনার ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক।